Wellcome to National Portal
মেনু নির্বাচন করুন
Main Comtent Skiped

ভাষা ও সংস্কৃতি

ভাষা ও সংস্কৃতি

undefined

 

      নিভৃত নিকুঞ্জ

               -তমসুর হোসেন

কদিন থেকে একটা বিষয় বেখাপ্পা লাগছে রুমানার। তাহল পারভেজের মোবাইলে কথা বলা। কৃষি ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ে সুপারভিশনের চাকরিতার। এখন কৃষকদের ইরি-বোরোর ভর্তুকির টাকা ব্যাংক একাউন্টে পেমেন্ট করাহবে। এ নিয়ে তার কাছে সারাদিন অনেক মোবাইল আসে। এখন এটা একটা গা সয়ে যাওয়াব্যাপার। কিন্তু রুমানা লক্ষ্য করছে অন্য জিনিস। মাঝে মাঝে পারভেজ কথা বলারজন্য বাইরে কোথাও যায়। সারাটা দিন সে তো অফিসে অথবা ফিল্ডে কাটায়। সেখানেসে কার সাথে কথা বলল না বলল তাতো রুমানা ওয়াচ করতে পারে না। কিন্তু যখন সেবাসায় থাকে বিশেষ করে সকাল এবং রাত আটটার পরে এই সামান্য সময়টুকুতে সে বারচারেক মোবাইল নিয়ে নানান অজুহাতে ঘরের বাইরে যায়। খুব সজাগ হয়ে রুমানালক্ষ্য করে কোন কোন সময় পারভেজের মোবাইলে মিস কল আসে। এতে তার ভাবগতি বদলেযায়। বাইরে যাওয়ার জন্য সে তখন ছুঁতো খুঁজতে থাকে। পারভেজের মোবাইল সেটহাতড়িয়ে মিসকল অপসন থেকে নাম্বারটি উদ্ধার করল রুমানা। নাম্বারটির শেষেট্রিপল সিক্স অংকগুলো এমনকি সম্পূর্ণ নাম্বারটিই তার স্মৃতির রাজ্যেমুহূর্তে খোদাই হয়ে গেল। বিষয়টি দারুণ অস্বস্তিতে ফেলল রুমানাকে। কার সাথেকথা বলে পারভেজ। কী এমন অনুরাগ অপর প্রান্তের ব্যক্তিটির সাথে তার। যারকারণে তার শ্রবণ এতটা উৎকর্ণ থাকে। অন্ততপক্ষে তার পরিচয় জানা থাকা দরকাররুমানার। নাম্বারটি উদ্ধার করার পর খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কীভাবে কোনকায়দায় সে কথা বলবে এই নাম্বারে। ওদিকের মানুষটি যদি পুরুষ হয়। হতেও তোপারে, কোন বিশেষ কাজ বা অফিসিয়াল গোপন লেনদেনের বিষয়ে পারভেজ কারও সাথে কথাবলে। রুমানার মন এসব খোঁড়া যুক্তি নস্যাত করে দিল। তার মন অপর প্রান্তেকোন ছলনাময়ীর অস্তিত্ব সনাক্ত করল। কোন কৌশলে সে তার সাথে কথা বলতে এই নিয়েঅনেক কথোপকথন করল সে নিজের সাথে। হাইকোর্টের একজন ঝানু আইনজ্ঞ অথবা কোনসফল নাট্যনির্মাতা যেমন করে জটিল বিষয়কে নিজের পথে নিয়ে আসে সুচিন্তিতআলাপচারিতার মাধ্যমে। তেমন করে প্রতিপক্ষের সাথে লড়বার জন্য নিজকেসুনিপুণভাবে প্রস্তুত করল রুমানা। বিদ্যালয়ের প্রথমার্ধের ঝামেলা শেষ হলেসে তার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে রিং করল ইতস্তত চিত্তে। ওপাশ থেকে ধ্বনিত হলনারীকণ্ঠের কোমল আওয়াজ।
‘হ্যলো, কে বলছেন'?
‘আমি একজন মানুষ। বলতে পারেন আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী। দয়া করে চিনে রাখুন। একদিন উপকারে লাগবে।'
‘উপকার, কি উপকারে লাগবেন আপনি আমার?'
‘আরে লাগবে। কার দ্বারা কী উপকার হয় বলা যায় না তো।
‘অমন না বলে একটু খুলে বলুন। আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।'
‘ভেবে দেখুন তো, কার সাথে দিনের পর দিন কথা বলছেন। সমস্যা তো সৃষ্টি করেছেনএকখানা। না জেনেশুনে কথা বলে। এখন বুঝেছেন কোন উপকারে লাগব আমি।'
‘না, না, অসম্ভব। আমি তো কারও সাথে কথা বলি না।'
‘আমি তো হাওয়া থেকে এ নাম্বার পাইনি। যার সাথে কথা বলেন সেই আমাকে দিয়েছে। শেষে ফাইভ নাইন সিক্স, দেখুন তো চেনেন কিনা?'
‘আপু মাফ করবেন। কামরান ভাই আপনার কি হয়?'
‘উনি আমার খালাত ভাই। এখন বুঝেছেন কোথাকার বাতাস কোথায় লাগছে।'
মেয়েটির নাম সীমা। তার সাথে কথা বলে রুমানা সব তথ্য জেনে নিল। বাড়িপায়রাবন্দ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্রী। হোস্টেলে থেকেপড়াশুনা করছে। কামরান তথা পারভেজের সাথে তার দুই বছরের চেনাজানা। তার বিয়েরআলাপও চলছে অন্যখানে। পাত্র সরকারি কলেজের লেকচারার। কিন্তু তাকে পছন্দহয়নি সীমার। ওর চেয়ে কামরান কত স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম। তাদের সম্পর্কেরবিষয়ে পরিবারকে এখনও জানায়নি সীমা। কামরান বলেছে সময় হলেই সেই প্রস্তাবনিয়ে যাবে। এ নিয়ে তাকে একটুও ভাবতে হবে না। সীমা একথাও বলল, মাঝে মাঝেতাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। কামরান আসে তার সাথে দেখা করার জন্য। সে ভাবছেএকদিন হুট করে চলে যাবে কামরানের বাড়িঘর দেখতে। চিরদিন যেখানে থাকতে হবে তাআগেভাগে দেখে নেয়াই ভাল।
এ কথাগুলো শোনার পর কার মেজাজ ঠিক থাকে। সীমার কাছে পারভেজ এখন কামরান। ঘরেনবোদ্ভিন্না স্ত্রী এবং অবোধ শিশু রেখে এসব নাটক সৃষ্টি করার কোন দরকারআছে তার। সীমার জন্য বড় দুঃখ হল রুমানার। আহা বেচারী, কতটা স্বপ্নের পেছনেছুটছে বোবা অন্ধের মত। যতই তার সাথে বাহানা করুক, পারভেজ কী তাকে স্বপ্নেরমনজিলে পৌঁছে দিতে পারবে। কেন এ লুকোচুরি! কেন একজনের বিশ্বাসের ভিত্তিভূমিনষ্ট করার মিথ্যা খেলায় মেতে ওঠা। রুমানার মন বলে পারভেজ সত্যিই একটাবিশ্বাসঘাতক! দু'বছরের অধিক দাম্পত্য জীবনে সে তো তাকে পেয়েছে প্রাণোচ্ছলএক সঙ্গী হিসেবে। রুমানার সব মতামতের মূল্য দিয়ে সে তাকে আত্মবিশ্বাসী হতেসাহায্য করেছে। আজ ওসব কোথায় গেল।
রুমানার দুশ্চিন্তা এত বেড়ে গেলো যে, সে অস্থির হয়ে পড়ল। কোন কাজেইসঠিকভাবে মন বসাতে পারল না। তারও তো একটা জব আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়েরসহকারী শিক্ষিকা সে। স্কুলে প্রথম সাময়িকী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেখানেএকগাদা কাজ। কাজের মেয়েটা অজুহাত দেখিয়ে চার পাঁচদিন থেকে কাজে আসছে না। আরসাকীটা যে এত পাজি হয়েছে তা বলে শেষ করা যাচ্ছে না। স্কুল থেকে এসে রুমানাদেখল সাকী ধুলোকাদায় একাকার হয়ে আছে। সাকীর দাদী তো সংসারের কাজ নিয়েব্যস্ত। আর ওর দাদু, আজ পর্যন্ত কোলে নিয়ে দেখল না ছেলেটার কতটুকু ওজন।সাকীকে গোসল করিয়ে রুমানা বাথরুমে ঢুকেছে ময়লা কাপড় কেঁচে দেয়ার জন্য। বেরহয়ে তার মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। টেবিল থেকে কার্টার নিয়ে সাকী তার হাতজখম করে বসে আছে। রক্তের দাগে লাল হয়ে আছে জামা কাপড় বিছানা বালিশ। কী করবেরুমানা এখন। তাড়াতাড়ি কাপড় ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। ওদিকে রান্নাঘরেও তোনা গেলে হচ্ছে না। তাড়াতাড়ি সবজি কাটতে যেয়ে চাকুতে আংগুল কেটে গেলরুমানার। কাটা জায়গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরতে লাগল। রক্ত দেখে একটুওঘাবড়ালো না সে। বন্ধ করার কোন ব্যবস্থাও নিল না। এর চেয়ে অনেক বেশি খুন ঝরেযাচ্ছে তার বুকের ক্ষত হতে। শাশুড়ি তার এ অবস্থা চেয়ে চেয়ে দেখল। একটিকথাও বলল না। সবজি কাটতে যে আংগুল জখম করে তার প্রতি সমবেদনার কী ভাষাথাকতে পারে।
গায়ে জ্বর উঠল রুমানার। কোন কিছুই সে মুখে তুলল না। সাকীকে খাইয়ে বিছানায়নুয়ে পড়ল। গা গুলিয়ে বমি আসতে চাচ্ছে তার। রক্ত সে মোটেই দেখতে পারে না।ব্যথানাশক একটা ট্যাবলেট অন্ততপক্ষে খাওয়া লাগতো। সাকীকে দুই চামুচপ্যারাসিটামল খাইয়ে দিয়েছে সে। ঘা সারানোর ওষুধও দেয়া লাগতো। কিন্তু কেকরবে ওসব। এ বাড়ির লোকেরা তো তার মাসের মাইনের অপেক্ষা করে থাকে। তার জন্যকার অন্তরে কতটুকু ভালবাসা আছে সে কথা রুমানা অনেক আগে টের পেয়েছে। অন্যসময় হলে পারভেজকে কল দিত রুমানা ডাক্তার নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু আজ দিল না।কি হবে ওসব চিকিৎসা টিকিৎসা করে। পারভেজের সাথে কি করে সে কথাবার্তা বলবেএই নিয়ে ভাবছে। তার কাছে যখন স্ত্রীর চেয়ে অন্য কারও আবেদন বেশি তখন কিআশায় সে বেঁচে থাকবে। এখনই মৃত্যু এলে তাকে খুশী মনে বরণ করবে রুমানা।একবার তার মন বলল সব ছেড়ে যেদিকে দু'চোখ যায় সেদিকে চলে যেতে। চাদরে মুখলুকিয়ে অনেক অশ্রু ঝরাল সে। ব্যথায় আক্ষেপে সে এতটা ভেঙ্গে পড়ল যে একখন্ডশুকনো মৃত্তিকার মতো নিঃশব্দে বিছানায় পড়ে থাকল। নিজকে নিয়ন্ত্রণ করার অনেকচেষ্টা করল সে। তীব্র ঝড়ো বাতাসে নীড়চ্যুত বিহঙ্গের মত একটু আশ্রয় খুঁজবারজন্য সে পার হল অনেক বাত্যাহত প্রান্তর। তাকে তো মুষড়ে পড়লে চলবে না। তাকেঅবশ্যই জয়ী হতে হবে।
রাত ১০টার পর বাসায় ফিরল পারভেজ। রুমানা এবং সাকীর ইনজুরির কথা শুনে সেব্যস্ত হয়ে পড়ল। ঘরে এসে রুমানাকে কোমল কণ্ঠে ডাকল সে। সাড়া দেবার ইচ্ছেছিল না তার। একটি কথা ভেবে সে স্বাভাবিক হল। সে মুখ গোমরা করে থাকলে পারভেজকারণ অনুসন্ধান করবে। উঠে বসার চেষ্টা করল রুমানা, কিন্তু পারল না। এত যেদুর্বল হয়েছে তার শরীর। মুখ দিয়ে কথাও বের হল না। রুমানার চোখে মুখে হাতবুলিয়ে সাকীর নিদ্রাচ্ছন্ন নিাপ মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে ডাক্তারকে আসারজন্য অনুরোধ করল পারভেজ। কল পেয়ে তড়িঘড়ি চলে এল ডাক্তার। ঘুমন্ত সাকীকে নাজাগিয়ে রুমানারই ব্যান্ডেজ দিল সে। খুব আন্তরিকভাবে ব্যবস্থাপত্র লিখেরুমানার মনে একগুচ্ছ সোহাগ ছড়িয়ে চলে গেল সে। ডাক্তার আসায় অনেক সুস্থতাবোধ করল রুমানা। ডা. সবুজের সান্নিধ্য তাকে কেন যে এতটা উল্লসিত করে ভেবেপায় না রুমানা।
একদিনের কথা তার মনে পড়ল। সাকীর বয়স তখন সবেমাত্র পাঁচ মাস। হঠাৎ করেপ্রচন্ড শ্বাসকষ্ট এবং কাশি হতে লাগল। দিনের বেলা তেমন সমস্যা না হলেও রাতেসাকীর অবস্থা খারাপের দিকে গেল। তখন ডাক্তারের সাথে ততটা জানাশুনা ছিল নাতাদের। পারভেজ ফোন করল তাকে। রুমানার বিশ্বাস হয়নি অত রাতে অমন ঘন ঘোরকুহেলিকায় আরামের শয্যা ছেড়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য কেউ ঘর থেকে বেরহবে। সবুজ এসে শুধু চিকিৎসাপত্র দিল না ওষুধ সংগ্রহ করে দিয়ে সাকীর দ্রুতনিরাময়ের সব ব্যবস্থাই করল। সেদিন থেকে সবুজ পরিবারের শুধু প্রিয় চিকিৎসকইহল না, মনের অজান্তে রুমানার প্রিয় বন্ধুতে পরিণত হল। প্রায় দু'বছর ধরেচলছে হৃদ্যতাপূর্ণ আলাপচারিতা। কিন্তু কখনও সে রুমানাকে বুঝতে দেয়নি তারভেতরে আছে বিপরীত লিঙ্গের এক সত্তা। রুমানার নারীত্বের দিকে কামনামদির কোনবাক্যই তিনি নিক্ষেপ করেননি আজ পর্যন্ত।
সবুজ তার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করলে বার বার স্তব্ধ করে দিয়েছিলরুমানা। পরিবারের তিনি একজন চিকিৎসক মাত্র। এর চেয়ে তো বেশি কিছু নন। কেনতিনি তার কর্মের বলয় পেরিয়ে হৃদয়কে নাড়া দিতে আসেন। তার এই আদিখ্যেতা তোকোনক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। আবার মাঝে মাঝে রুমানা আত্মবিস্মৃত হয়ে তারসাথে অনেক কথা বলেছে। সান্দ্র বর্ষণের মতো নিবিড়। দূরাগত সুমিষ্ট সংগীতেরমত অনুনয় ব্যাকুল তার বাণীর রম্যতা রুমানাকে টেনে নিয়ে গেছে এক ছায়াচ্ছন্নপ্রান্তরে, যেখানে কচি ঘাসের মসৃণ চাদরে পা ফেলে সে অচেনা আনন্দে ভেসেগেছে। সবুজের অবারিত আকর্ষণের অনতিক্রম্য দেয়ালে আটকা পড়ে সহসা অস্বস্তিবোধ করতে থাকে রুমানা। হঠাৎ সে তার মোবাইল বন্ধ করে দেয়। এভাবে এক নাগাড়েসে চারমাস মোবাইল বন্ধ করে রাখে। রুমানা জানে এতে করে কতটা দুঃখ পাচ্ছেসবুজ। তবু তাকে কষ্টের নদীতে নিক্ষেপ করেছে সে। অথচ সেই একদিন সবুজকেবলেছে, ‘আবার কথা হবে যেদিন আকাশে জাগবে সুনির্মল চাঁদ, ঝিরঝির বাতাসেনির্জনা বারান্দায় নাচবে নারকেল ছায়া।' কিন্তু গগনে চাঁদ জাগলেও কথা আরহয়নি দু'জনের। চেষ্টা করে করে ব্যথিত মনে এক সময় সবুজও কল করা বন্ধ করেছিল।এ নিয়ে রুমানা তেমন কিছু ভাবেনি। তার ব্যবহারে কে কষ্ট পেল এ নিয়ে তার কোনমাথাব্যথা নেই। কিন্তু এক সময় তার নিজেরই খারাপ লাগতে শুরু করল। যখন আকাশেশান্ত জোসনার নিঃশব্দ বিভোর সকল হৃদয়ে আলো ঢেলে দিল তখন সে সবুজের কথাভেবে কষ্ট পেল। যার কথাগুলো স্নিগ্ধ সমীরণ হয়ে তার অবরুদ্ধ হৃদয়ের কড়ানেড়েছিল। কৃষ্ণচুড়ার ডালে বিরহী বিহংগ হয়ে যায় উচ্চাশা হৃদয়বৃন্তে ঢেলেদিয়েছিল স্বপ্নকুঁড়ি তাকে খুব করে মনে পড়ল রুমানার। মোবাইল তুলে সে প্রথমযাকে কল করল সে হল সেই বঞ্চিত মানুষ যার অন্তর জুড়ে রুমানার নামটিই অনুরণিতহয়। কদিন থেকে রুমানার মনে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সবুজকে তার কিছুই জানতে দেয়নিরুমানা। এমনকি তার কোন কলই সে রিসিভ করেনি। খুব একটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলসে। এখন সে যে এত সব তথ্য উদ্ধার করল তা কাকে জানাবে। এমন আপন তো কেউ নেইতার। সবুজ ছাড়া এমন বন্ধু কে আছে তার যার কাছে সে সার্বিক সুন্দর। চাঁদেওতো কৃষ্ণতিলক আছে। কিন্তু সবুজের কাছে রুমানা নির্দোষ এবং অতুলনীয়া।রুমানাকে আহত করে একটি শব্দও উচ্চারণ করে না সে। অমন করে রুমানাকে তো কেউভালবাসে না। সবুজের কাছে অবশেষে কল করল রুমানা।
‘হ্যালো স্লামালেকুম'।
‘ওয়ালাইকুম আছছালাম। কী ব্যাপার কল রিসিভ করছ না কেন?'
‘হারিয়ে গেছি। এদিকে অনেক ঘটনা হয়ে গেছে। অন্যখানে কথা বলতে হয়েছে।'
‘আরেবাশ। সেজন্য অধমকে এত শাস্তি দেয়া হচ্ছে।'
‘শুনুন আজ আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। অনেক কথা। মোবাইলে বলা যাবে না।'
‘আচ্ছা। তাহলে কখন আসছ। আমার যে তাড়া আছে।'
‘তাড়া সেরে নিন। বিকেলে আসছি।'
বিকেলে রেস্তোরাঁয় বসে সবুজকে সব কথা খুঁটে খুঁটে বলল রুমানা। কদিনেই তারচেহারার উজ্জ্বলতা উবে গেছে। কেন এমন হল তার জীবনে। এখন সে ত পারভেজের সাথেস্বাভাবিক হতে পারছে না। তাকে অনেক সান্ত্বনা দিল সবুজ। মেঘপুঞ্জ থেকেসতেজ হাওয়া এনে তার গোলাপী অধরে ছুঁয়ে দিল। সাগরের বিস্তীর্ণ বেলাভূমি থেকেউর্মিমালার উল্লাস এনে মেখে দিল তার বিষণ্ণ অবয়বে। বৃষ্টির ছোঁয়ায়মৃত্তিকা যেমন প্রাণময় হয়ে উঠে তেমন সুখময় উচ্ছাস রুমানার সত্তার গভীরেতরঙ্গিত হল। তার দুমড়ে যাওয়া অনুভূতি আবার সরব হয়ে উঠল।
‘সেই কবিতাটি। কিন্তু এখনও দেননি।'
‘কোন কবিতা!'
‘ঐ যে যখন আকাশে চাঁদ উঠবে- কথা বলে কথার অরণ্য হবে।'
‘ও আচ্ছা, দেব অবশ্যই দেব। ওটাতো তোমাকে নিয়েই লেখা।'
‘দেখেছেন, আমার দেয়া একটু কষ্টে কত সুন্দর কবিতা হয়েছে।'
‘সীমা পারভেজের বন্ধুত্ব তো এমনই।'
‘অবশ্যই নয়। আপনার বন্ধুত্ব বৃষ্টির মত স্বচ্ছ। রোদের মত অবারিত।'
‘থাক, আর কাব্য করতে হবে না।'
‘কবি কি আমি। কবি তো আপনি।'
সবুজের কাব্যপ্রতিভার সন্ধান পেয়েছে রুমানা। পাঁচ বছর আগে প্রকাশিত একটিকবিতাগ্রন্থে রুমানার দেহসৌষ্ঠবের বাস্তব স্ফুরন ঘটেছে। আশ্চর্য না হয়েপারা যায় না, সেখানে তার নাম ব্যবহার করে একটি কবিতাও আছে। কী করে এটাসম্ভব।
‘‘রুমানার সোনালী অধরে পাখি ওড়ে, হাসি ঝরে সারাক্ষণ
বোশেখী ঝড়ে বিদ্যুৎ নাচে ফনা তোলে কালো মেঘ অগণন’’
কী করে তিনি এমন আশ্চর্য কবিতা লিখতে পারলেন। উনি বলেন, রুমানা আমি তোমাকেবাস্তবে দেখার আগে মনের মুকুরে শতবার প্রত্যক্ষ করেছি। তোমার বিমুগ্ধ ছবিআমি পথের মসৃণ বিস্তারে খুঁজে ফিরেছি। আজ আমি ধন্য এজন্য যে, তোমার সাথেআমার দেখা হয়েছে। কল্পনার দুঃসহ আবর্তে আমাকে ঘুরে মরতে হচ্ছে না। যখনইচাচ্ছি, তোমার সাথে দেখা করতে পারছি। এ কথাগুলো বিশ্বাস করতে আগে খুব কষ্টহতো রুমানার। এখন তার মনের আকাশ থেকে সন্দেহের মেঘ কেটে গেছে।
সীমাকে নিয়ে পারভেজের কি হবে? যে প্রণয়ের সূচনা হয়েছে মিথ্যা ও প্রতারণারঅনুর্বর ভিত্তির ওপর তা নির্ঘাত আহত করবে সীমাকে। রুমানা ইচ্ছে করলে এখনইওর স্বপ্নের প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু তা সে করছে না। অতটাতাড়াহুড়োর কি আছে। পারভেজ যদি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় তাহলে তোরুমানার হাত পা ছুঁড়ে লাভ নেই। আর যদি সে রুমানাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়তখন স্বভাবতই সীমা হবে কল্পনালোকের নিভৃতচারিনী। যখন তার প্রণয় মহীরুহেরশিকড়ে বাসনার রস সিঞ্চিত হবে না তখন আপনাতেই তো দিবসের উন্মুক্ত খরতাপেশুকিয়ে যাবে। সীমার প্রতি কেন জানি তার মায়া হয়। একটি চঞ্চলা মেয়ে নবীনবাসনার উদ্দাম শকটে চড়ে দ্রুত সরে যাচ্ছে অশুভ গন্তব্যের দিকে। কান্নাই হবেযার একান্ত সাথী, রাতজাগা পেঁচকের কর্কশ শব্দ যার অখন্ড চেতনাকে বিক্ষতকরবে। এখান থেকে সীমাকে উদ্ধার করার কোন পথ তার জানা নেই। সীমার কাছেসবকিছু গোপন রেখে রুমানা তাকে কিছুটা অবকাশ দিচ্ছে। হোক না সে একটু আশারভুবনে সঞ্চরণ করুক। দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীর মতদুঃস্বপ্নের রাতে বাঁচার স্বপ্ন দেখুক। সীমাকে মোবাইল করে সে।
‘আপু একটা কথা বলি।'
‘কী কথা বলুন না।'
‘আজকাল ছেলেরা তো অহহর বিট্রয় করছে। কামরান ভাই যদি তেমন কিছু করে।'
‘সেটা আমিও ভাবছি। না না, ওকে দেখে তেমন মনে হয় না।'
‘তবু সাবধান হতে তো দোষ নেই। বিয়েটা চুকে ফেললে ভাল হয় না?'
‘আমি তো তাই চাচ্ছি। কামরানই ডিলে করছে। ও বলছে আমার পাসটা হোক।'
‘দেখুন আমার কথা আমি বললাম। আমি কিন্তু ছেলেদের মাথামুন্ডু কিছুই পাইনে।'
মনকে অনেক সান্ত্বনা দিল রুমানা। পৃথিবীতে একজন আরেকজনের বন্ধু হতেই পারে।বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী শক্তি মানুষকে টেনে এনেছে একেবারে কাছাকাছি। ভাষা, বর্ণএবং ভৌগোলিক দূরত্ব কমিয়ে মানবতাকে দাঁড় করিয়েছে একই সমতলে। হয়ত সীমারমধ্যে আছে আলাদা মাধুর্য, আলাদা ভাললাগার বিষয়বস্তু। তাই বলে তার কাছে সবসত্য গোপন করে মিথ্যার জাল বুনতে হবে? কেন পারভেজ একথা বলল না সে সীমারএকজন বন্ধু হতে চায়। যেমন রুমানাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করেছে সবুজ। যাকে সেরোদের মত প্রাঞ্জল এবং পরিশুদ্ধ বলে জানে। রুমানার সব হতাশাকে জোসনার সৌরভদিয়ে ধুয়ে দেয় সে। সে তো মিথ্যার ধোঁয়ায় তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করেনি। এমনএকজন ভাল বন্ধুকে রুমানা কখনও দূরে ঠেলে দিতে পারবে না। তাকে দুরে ঠেলারকোন যুক্তিই সে আবিষ্কার করতে পারেনি। রুমানা এখন স্পষ্ট করে বুঝতে পারছেএকজন ভাল বন্ধুর কতটা প্রয়োজন। এ দু'বছর সবুজ তাকে যতটা খুশি করার চেষ্টাকরেছে বিভিন্ন উপহারে তা তার ধারণারও বাইরে। কেন তিনি ওসব দিচ্ছেন? এসম্পর্কে সে সবসময় মনে নেগেটিভ ধারণা পোষণ করেছে। কিন্তু গত কুরবানী ঈদেরুমানার যখন অনেক টাকার দরকার হল তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে কল করল। তার মনেএ ধারণা কখনই ছিল না যে সবুজ তাকে নিঃসংশয়ে অতগুলো টাকা দেবে। কিন্তু সবুজতাকে ফিরায়নি। কোন প্রশ্ন না তুলে সহাস্যচিত্তে টাকাগুলো দিয়েছে সবুজ। কোনডকুমেন্ট রাখবার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এখন মানুষকে বন্ধু না বলে কাকে বলবেসে। এখন তার মনে একজন বিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে বিরাজ করছে ডা. সবুজ। এইনির্দোষ, নিরীহ লোকটি মনের ভুবন থেকে বের করে দিতে কখনই পারবে না রুমানা।
দু' চারদিনের আলাপে সীমার প্রতি গভীর মমতা জন্ম নিল রুমানার মনে। মেয়েটারকণ্ঠে একটা মারাত্মক যাদুকরী শক্তি আছে। দূরাগত কোন ছন্দময় সুর যেন সমুদ্রতরঙ্গের ওপর দিয়ে লাফিয়ে এসে কানের ভেতর গড়িয়ে পড়ে। শব্দগুলো এক বিশেষভঙ্গিমায় বিন্যস্ত হয়ে হৃদয়কে করে তোলে উদাস উন্মন। অশ্রুত সব সুরেরকারুকার্য কণ্ঠে ধারণ করে সে বিচরণ করে অচেনা জগতে। কী এক দুর্বার আকর্ষণেরুমানা তার দিকে ছুটে যেতে চায় তা সে নিজেই জানে না। রুমানা ভাবে এমন করেব্যক্তিত্বহীন হওয়া তার কি ঠিক হচ্ছে। যে সীমা তার বুকে অশান্তির প্রদাহজ্বালিয়ে দিয়েছে তার প্রতি দুর্বল হওয়া নিজের প্রতি অবিচার করার নামান্তর।পারভেজকে নিয়ে সীমার স্বপ্নগুলো মন দিয়ে শুনেছে রুমানা। তার হৃদয়েরপ্রতিধ্বনিই তো বাজে সীমার মধ্যে। একটি সাজানো সুখের নীড়, একটি কচি মুখেরপ্রাণবন্ত হাসি আরও কত কিছু। না না এমনটা হবে কেন? এসব তো তার একান্তস্বপ্ন। তার স্বপ্নগুলো সীমা নির্দয়ভাবে ছিনিয়ে নিতে চায়। রুমানা ভাবল, সেঅবশ্যই দেখা করবে সীমার সাথে। তারপর তাকে বুঝাবে সে রুমানার কতটা ক্ষতিকরছে। তার স্বপ্নের নিভৃত নিকুঞ্জ সে তছনছ করছে কোন অধিকারে। তাদের ছোটসংসারের আবেগঘন মুহূর্তের একটি ছবি সে দেখাবে সীমাকে। তখন সীমা অবশ্যইবুঝবে কোন ভংগুর মৃত্তিকাটিলায় দাঁড়িয়ে সে চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়েছে।
সীমার সাথে দেখা করতে রুমানা রংপুর যায়। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠেইতাদের দেখা হয়। একান্ত বন্ধু হিসেবে সবুজ সঙ্গ দেয় তাকে। কামরান সম্পর্কেঅনেক কথা বলে সীমা। তার একান্ত প্রিয়, হৃদয়ের রাজা কামরান তাকে কখনই কষ্টদিতে পারবে না। রুমানা সব শোনে। কোন কথাই বলতে পারে না সে। সবুজ একখানা ছবিতুলে দেয় সীমার হাতে। ‘দেখুন তো আপামনি এ ছবিখানা চিনতে পারেন কিনা। আরশুনুন আপনি যাকে কামরান বলে জানেন তার নাম পারভেজ। আর ইনি হচ্ছেন তারস্ত্রী রুমানা। ছবির দিকে এক পলক দেখেই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল সীমার।দু'হাতে মুখ ঢেকে সে ছুটে চলে গেল অন্যদিকে। তাকে ডাকতে যেয়েও ডাকতে পারলনা রুমানা। প্রশ্নপূর্ণ চোখে সবুজের চোখের দিকে তাকাল সে। সেখানে সে শান্তসুমধুর এক প্রান্তর দেখতে পেল। যেখানে দাঁড়িয়ে পারভেজ তাকে ডাকছে, অবাধআনন্দমুখর অন্তহীন ভালবাসার দিগন্তে।